“পশ্চিমা সভ্যতা” একটি ব্যঙ্গাত্মক শব্দ


এম,এ হক

এটা খুবই অদ্ভুত যে পশ্চিমারা চায় না তদেরকে একক ভাবে পশ্চিমা বলে ডাকা হোক বিশেষ করে তাদের ভুল-ত্রুটির ক্ষেত্রে।   অথচ তারা চায় যে সবাই তাদের মতাদর্শের অধীনে একত্রিত হোক।  এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মতামত ভুলও হতে পারে।  

        পশ্চিমারা সবসময় সভ্যতার জয়গান গেয়ে যায়।  কমবেশী আমরা সবাই একথা শুনেই বড় হয়েছি যে পাশ্চাত্যের অর্জন, পাশ্চাত্য চিন্তা, পাশ্চাত্যের জ্ঞান একথায় পাশ্চাত্যের সবই সুন্দর।  পশ্চিমারা তাদের বিবেচনায় যা ভাল মনে করে পশ্চিম হিসাবে তারই যৌথভাবে এর কৃতিত্ব নিতে চেষ্টা করে।  কিন্তু পাশ্চাত্যের খারাপ কোনো কিছুর দায়ভার তারা নিতে চায় না।  

                   যখন পাশ্চাত্যের খারাপ দিক সম্পর্কে বলা হবে তখন তাদের উত্তর হয় অনেকটা এরকম, “আপনি ঠিক কোন পশ্চিমের কথা বলছেন, পশ্চিম বলতে আপনি কাকে বোঝেন”?

ডগলাস মুরে,জর্ডান পিটারসন,স্যাম হ্যারিস,রিচার্ড ডকিন্স অথবা ক্রিস্টোফার হিচিন্সের মতো লোকদের কথা শুনলে মনে হবে ইউরোপের প্রত্যেক দেশের লোকই সিস্টিন চ্যাপেল আঁকায় অংশগ্রহণ করেছিল।   টেলিফোন থেকে বিমান, মাইক্রোচিপ এমন কি পেনিসিলিনও তারা সম্মিলিতভাবে আবিষ্কার করেছিল।  পাশ্চাত্যের দাবী তারা দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছে, নারীদের ভোটের অধিকার দিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন করেছে তখন তারা নিজেদেরকে এককভাবে পশ্চিম বলতে পছন্দ করে।

      কিন্তু যখনই পশ্চিমাদের অগণিত নৃশংসতার চিত্র তুলে আনা হয় তখন তাদের উত্তর হবে, “কে, আমি? আপনি নিশ্চয়ই আমাকে অন্য করো সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন।  আমার বাপ-দাদারা ক্রীতদাসপ্রথায় সম্মতি দেয়নি, আমার বাপ-দাদারা আদিবাসী আমেরিকানদের হত্যা করেনি।  আমার পূর্বপুরুষেরা ছিল নিরীহ কৃষক ইত্যাদি ইত্যাদি।  তারা কৃতিত্ব নিতে চায় অথচ দোষের ভাগ নিতে চায় না।

                পশ্চিমারা দাবী করে আইসাক আইনস্টাইন, নিউটন, মাইকেলেঞ্জেলো, মোজার্ট, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, টমাস এডিসন, স্টিভ জবস তাদের।  কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু খারাপ লোকও আছে যাদের তারা পশ্চিমের বলে মেনে নিতে নারাজ।  

               যেমন হিটলার, রাজা লিওপোল্ডও তো পশ্চিমেরই, হ্যারি ট্রুম্যান মানব জাতির ইতিহাসে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশী মানুষ হত্যা করেছিল।  কোরিয়ান যুদ্ধ থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্য-দক্ষিণ আমেরিকার যুদ্ধ যা পানামা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে; ইরাক, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ট্রুম্যানের আগে যে সব যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এগুলোর সবগুলোতেই পশ্চিমারা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত।  

          আমার মনে হয় না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন একটি দশক আছে যখন তারা বিশ্বের কোনো না কোনো স্থানে মানুষ হত্যা করেনি।  এরাও পশ্চিমা সভ্যতারই অংশ।  কিন্তু এই অপরাধগুলো উত্থাপিত হলেই পশ্চিমারা এর দায় ভার নিতে অস্বীকার করে।  পশ্চিমাদের অপরাধের তালিকা করার চেষ্টা করলে হয়ত তার সবগুলো আমরা মনেও রাখতে পারব না।  

        কিছু পশ্চিমা মহিলা একবার কোনো এক মুসলিম নেতাকে প্রশ্ন করেছিল, কেন মুসলিমরা মুসলিম অপরাধীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা করে না? তাঁর উত্তর ছিল, কোন মুসলিমই এসবের নিন্দা করে না কিন্তু যখন পশ্চিমের কেউ মসজিদে ঢুকে মুসলিমদের হত্যা করে তখন আপনারা নিন্দা করেন না কেন?

           পশ্চিমারা উইনস্টন চার্চিলের মূর্তি  বানিয়ে রেখেছে যে কিনা লাখ লাখ বাঙ্গালীকে অনাহারে হত্যা করেছিল এবং কুর্দিদের উপর বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যা করেছিল।  অথচ পশ্চিমারা এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিচার করা তো দূরে থাক এর কোনো নিন্দাও পর্যন্ত করে নি।  বরং পশ্চিমারা এসমস্ত লোকদের পুনর্নির্বাচিত করে এবং তাদের এই নৃশংসতার দায়ও তারা অস্বীকার করে।

        কোনো ইতিবাচক অর্জনের ক্ষেত্রে যদি তারা নিজেদেরকে পশ্চিমা সম্বোধন করতে পছন্দ করে তাহলে অমানবিক নৃশংস গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, ধর্মান্ধতা, শোষণ, নিপীড়ন, গুপ্তহত্যা, অভ্যুত্থান এবং পরাধীনতার সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রেই তাদেরকে পশ্চিমা বলা হবে।

        তাই আমার মতে, “পশ্চিমা সভ্যতা”একটি ব্যঙ্গাত্মক শব্দ।  কারণ তারা কখনই সভ্য ছিল না।  তারা অনেক নিত্য-নতুন উদ্ভাবন করেছে কিন্তু তা তাদের ন্যক্কারজনক কাজ ঢাকতে যথেষ্ট নয়। নৈতিকতার প্রতি পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল তারা ন্যায়পরায়ণ না হলেও তাদেরকে বলতে হবে তারা ন্যায়ের পক্ষে আছে।  ততক্ষন পর্যন্ত তারা খারাপ না, যতক্ষণ না তারা এটা স্বীকার করে।  

      পশ্চিম প্রতিটি দিনই যেন আরও অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে।  এটা কোন আশ্চর্যের বিষয নয় যে, এখন পশ্চিমে কোনো পুরুষ নিজেকে মহিলা মনে করলে সে মহিলা আর কোনো মহিলা নিজেকে পুরুষ মনে করলে সে পুরুষ।  কারণ এটিই পশ্চিমারা সর্বদা বিশ্বাস করে এসেছে।

               পশ্চিমারা নিজেদেরকে নৈতিক, ধার্মিক, স্বাধীনতা কামী সহনশীল হিসাবে উপস্থাপিত করতে চায় যদিও কখনই তারা তা ছিল না এবং বিশ্বের কেউই তাদেরকে ঐভাবে দেখে না।  কিন্তু তবুও তারা সারাবিশ্বকে জোর করে নিজেদেরকে ঐ নামে ডাকতে বাধ্য করতে চায়।  তারা একটি ভ্রান্তধারণা নিয়ে সবসময় চলতে পছন্দ করে।  

            পশ্চিমা বর্বরতার যারা শিকার তারা পশ্চিমাদের সংজ্ঞায়িত করার যেন কোন অধিকারই রাখে না।  যেভাই হোকনা কেন পশ্চিমারা নিজেদেরকে নির্দোষ বলে দাবী করে।  খুবই ভালো কথা তারা নির্দোষ, তাদের পূর্বপুরুষরা সম্ভবত দরিদ্র কৃষক ছিল, আমি তাদের সাথে একমত।  তারা পাশ্চাত্যের অপরাধ, উপনিবেশ বা সাম্রাজ্যবাদে অংশগ্রহণ করেনি।  কিন্তু তাহলে তাদের পশ্চিমের অর্জন নিয়ে গর্ব করারও কোনো কারণ নেই।

       তারাও তাহলে কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমা বর্বরতার শিকার।  পশ্চিমা বলে দাবী করা ব্যক্তিরা যদি অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চায় তবে পশ্চিমা অর্জন থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিৎ।  এবং তাদের উপলব্ধি করা উচিৎ যে তারা এবং তাদের পূর্বপুরুষরা পশ্চিমাদের দ্বারা পরিত্যক্ত এবং প্রতারিত।  কেউ কখনও তার বা তাদের পূর্বপুরুষদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেনি, কেউ কখনও তাদের কল্যাণের কথাও চিন্তা করেনি।  

                  কিন্তু এখানে পশ্চিমা বলে সঙ্গায়িত লোকেরা তাদের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে কি রক্ষা করতে চাচ্ছে।  আমি এবং পশ্চিমা বলে সঙ্গায়িত সাধারণ লোকেরা জানি অনাহারে মারা গেলে বা গৃহহীন হলে বা ঋণের মধ্যে ডুবে গেলে পশ্চিমের কিছু যায় আসে না। আপনার কাছে যদি জীবন খুব কঠিন মনে হয় এবং সিদ্ধান্ত নেন যে আপনি আত্মহত্যা করবেন তাহলে তারা আপনাকে তা করতে সহায়তা করবে। এটাই পশ্চিম আর এটাই পশ্চিম পশ্চিমাদের নিয়ে ভাবে।  পশ্চিম পশ্চিমাদের সঠিক শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেনি।  আপনার জ্ঞান বা শিক্ষা আছে কিনা তা তারা চিন্তা করে না।  আপনি পড়তে বা লিখতে না পারলেও তারা আপনাকে পরবর্তী স্তর বা শ্রেণীতে নিয়ে যাবে।  আপনার জীবনের প্রতিটি দিন আপনার চারপাশে আপনার পশ্চিমা সভ্যতা বিভিন্ন কণ্ঠে আপনাকে চিৎকার করে বলছে যে আপনি ভাগাড়ের বস্তু বৈ আর কিছুই না।  কিন্তু তবুও পশ্চিমারা একে মানবজাতির পরিমার্জনের শিখর হিসাবে রক্ষা করে যাচ্ছে।  এই মিথ্যা মন্ত্রকেই উৎরে যেতে হবে।  

       আমি শুধু আমার লেখায় বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে পশ্চিমাদের মিথ্যা প্রচার ও প্ররোচনা থেকে সবার বেরিয়ে আসতে হবে।  পশ্চিমারা যদি এ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে না চায় তাহলে কেউই তা করতে পারবে না।  


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *